ডেস্ক রিপোর্ট || জলকদর নিউজ || জাতীয় || শিক্ষা
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি বন্ধ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠনের আহ্বান
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কাঠামোগত সংস্কার, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ এবং প্রশাসনের দলীয়করণের প্রতিবাদে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবি ছিল অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।
কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে পিএসসিসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ উঠছে বলে দাবি করেন তিনি।
নূরুল ইসলাম বলেন, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে সরকার জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিচ্ছে না। পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, পিএসসিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তিনটি পৃথক কমিশনে পুনর্গঠন করতে হবে। এসব কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। অথচ সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন পিএসসি কমিশনের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে পরিচয় গোপন রেখে কোডভিত্তিক লিখিত খাতা মূল্যায়ন, একই খাতার বিভিন্ন প্রশ্ন পৃথক পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন, ভাইভার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা, কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ পদ্ধতি চালু, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় ডিজিটাল ব্যবস্থা এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি।
তবে এসব সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করেছেন। পরবর্তী সময়ে কমিশনের দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমানের পদত্যাগ এবং কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ ছাড়া পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে ২০০ করার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থীকে নিয়োগপত্র না দেওয়ার অভিযোগও তুলে ধরে সংগঠনটি। তাদের দাবি, বাদ পড়া প্রার্থীদের নিয়োগ না দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে প্রার্থী বাদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে, যা সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা সরকারি চাকরিতে সুযোগের সমতার পরিপন্থী।
এ ছাড়া ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলা হয়, এতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধার গুরুত্ব কমে গিয়ে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
৪৫তম বিসিএসে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্য থেকে ৫৬ জন এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রথম গেজেটে ৫৭ জনকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দেওয়া নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী বলে দাবি করে সংগঠনটি।
ছাত্রশিবিরের ১৩ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকারের কাছে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী পিএসসির কাঠামোগত সংস্কার এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন।
২. নবম ও দশম গ্রেডের সরকারি চাকরির সব নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া, পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
৩. কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ, প্রশ্নফাঁস রোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতিসহ মোনেম কমিশনের সংস্কার উদ্যোগ বহাল রাখা।
৪. মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোকে অনুমোদিত শূন্য পদ, সম্ভাব্য অবসর, নতুন পদ সৃষ্টি ও জনবল চাহিদার তথ্য নির্ধারিত সময়ে পিএসসিকে সরবরাহ করা এবং সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা।
৫. নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্নের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিয়োগের প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ও বিলম্বের কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করা।
৬. রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রার্থীর প্রতি বৈষম্য বন্ধ করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা।
৭. সাধারণ সরকারি নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্নের সময়সীমা নির্ধারণ এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, মানদণ্ড, কর্তৃপক্ষ ও সময়সীমা প্রকাশ করা।
৮. জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রাসঙ্গিক অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ ভেরিফিকেশন সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা।
৯. ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং আপিল ও পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা রাখা।
১০. পদের ধরন ও দায়িত্ব অনুযায়ী লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর নির্ধারণ এবং মৌখিক পরীক্ষায় অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ও রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
১১. মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর প্রদান ও মূল্যায়নে অসংগতি পর্যালোচনায় ভাইভার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করা।
১২. প্রশ্নফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষা ও অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধে নিরাপদ প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি, দক্ষ জনবল ও আধুনিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
১৩. সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৮, ১৯ ও ২০ ধারাসহ প্রাসঙ্গিক বিধান পর্যালোচনা করে নিয়োগ, পদোন্নতি, মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, দক্ষতা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক সুমন সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান, ঢাকা কলেজ শাখা সভাপতি মোস্কাকিম আহমেদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।



