ক্যাম্পাস (চবি) প্রতিনিধি || জলকদর নিউজ || শিক্ষা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পর প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসে নির্মিত হতে যাচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি)। পাঁচতলা আধুনিক এ ভবন নির্মাণে ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকার সরকারি অর্থায়নের একটি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য ক্যাম্পাসে গড়ে উঠবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় মিলনকেন্দ্র। সেখানে একাডেমিক আলোচনা, সেমিনার, কর্মশালা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে প্রায় ১০ হাজার ৪৮০ বর্গমিটার আয়তনের পাঁচতলা ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে থাকবে আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি, পাঠকক্ষ, একাডেমিক বই ও গবেষণাসামগ্রীর দোকান, প্রিন্টিং ও ফটোকপি সেবা, এটিএম বুথ, ক্যাফেটেরিয়া ও রেস্তোরাঁ।
এ ছাড়া সেমিনার, কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য লেকচার হলসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হবে। প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য থাকবে র্যাম্প, প্রবেশগম্য লিফট ও বিশেষ উপযোগী শৌচাগার। পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধ পান করানোর কক্ষ, নামাজের কক্ষ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ২০০ কেভিএ জেনারেটর, দুটি যাত্রীবাহী লিফট ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকবে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারীতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় একাডেমিক বই, রেফারেন্স বই ও গবেষণা সামগ্রী সংগ্রহে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ক্যাম্পাস শহর থেকে দূরে হওয়ায় এসব উপকরণ সংগ্রহ করতে অনেককেই চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়। নতুন টিএসসি চালু হলে এ নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, ২ হাজার ৩১২ দশমিক ৩২ একর আয়তনের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছেন ২৬ হাজার ৬৭৮ জন এবং শিক্ষক ১ হাজার ১০ জন। কেন্দ্রটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষক বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি শিক্ষাসামগ্রী ও গবেষণা সামগ্রী সংগ্রহে শহরের ওপর নির্ভরতা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। ২০২৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সুবিধা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ উদ্যোগ।
তিনি বলেন, শহর থেকে দূরে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ও রেফারেন্স বই সংগ্রহে সংকট রয়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যও ক্যাম্পাসে অবকাঠামোগত ঘাটতি ছিল।
টিএসসি নির্মিত হলে একাডেমিক ও গবেষণার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাজে শহরে যাওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গত ১৯ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপিপি সংশোধন করে সম্প্রতি পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কম হওয়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। চলতি নভেম্বর মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম টিএসসি নির্মিত হলে এটি শুধু একটি ভবন নয়, বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


