27 C
Dhaka
Monday, October 5, 2026

১৩২০ মেগাওয়াটের আলো বনাম ৪২ মেগাওয়াটের অন্ধকার ; বাঁশখালীর এই নির্মম পরিহাস আর কতদিন ?

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান

জাতীয় প্রগতির মহাযজ্ঞে যে জনপদ নিজের পরিবেশ, ফুসফুস আর সুনীল দিগন্তকে নিঃশর্তে আহুতি দিয়েছে, সেই বাঁশখালীর বুকেই আজ বিরাজ করছে এক অন্ধকারতম ঔপনিবেশিক শোষণতুল্য বৈপরীত্য। চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চল বাঁশখালীতে স্থাপিত ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত সুবিপুল বিদ্যুৎ যখন জাতীয় গ্রিডকে আলোকোজ্জ্বল করছে, তখন এই জনপদের ক্ষুব্ধ ও প্রান্তিক গ্রাহক সমাজ মাত্র ৪২ মেগাওয়াটের ন্যূনতম বিদ্যুৎ প্রাপ্তি থেকে নির্মমভাবে বঞ্চিত।

২৪ ঘণ্টার আবর্তে গড়ে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিস্তৃত লোডশেডিংয়ের এই দীর্ঘস্থায়ী বিভীষিকা স্থানীয় জনজীবন, অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দিয়েছে। নিজের আঙিনায় শতভাগ দূষণ আর বিষাক্ত বাতাস বুকে ধারণ করেও বাঁশখালীবাসীর কপালে জুটছে কেবল দীর্ঘশ্বাসের তিমির। কয়লা বিদ্যুতের এই করাল গ্রাস বাঁশখালীর অস্তিত্বকে এক বহুমাত্রিক সংকটে নিপতিত করেছে।

প্রথমত, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনী থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ক্ষতিকারক ফ্লাই অ্যাশ অঞ্চলের উর্বর কৃষিজমি, লবণ মাঠ এবং সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় (Ecological Catastrophe) ডেকে আনছে।

দ্বিতীয়ত, বিষাক্ত ভারী ধাতুর প্রভাবে স্থানীয় জনস্বাস্থ্যে তীব্র শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ব্যাধি ও চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অথচ, এই চরম ত্যাগের বিপরীতে বাঁশখালীর ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য আজ বিদ্যুৎহীনতার যাতাকলে পিষ্ট। তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি সেচ ব্যাহত হচ্ছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। নিজের ঘরের সম্পদ লুট করে দূরবর্তী মহানগরীকে আলোকিত করার এই বৈষম্যমূলক নীতি কেবল ভৌগোলিক অবিচারই নয়, বরং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

বাঁশখালীর আপামর শোষিত জনতার পক্ষে আমাদের অনমনীয় ও দ্ব্যর্থহীন সম্পাদকীয় অবস্থান বাঁশখালীর মাটিতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সর্বাগ্রে বাঁশখালীর ৪২ মেগাওয়াটের স্থানীয় চাহিদা শতভাগ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে পূরণ করতে হবে। স্থানীয় জনপদের অধিকারকে পাশ কাটিয়ে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের নীতি অবিলম্বে পুনঃমূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, কোনো অঞ্চলের জনগণকে দীর্ঘকাল অন্ধকূপে বন্দি রেখে জাতীয় সমৃদ্ধির টেকসই ইমারত নির্মাণ করা অসম্ভব। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা অনতিবিলম্বে পরিহার করে বাঁশখালীর শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হোক; অন্যথায় এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যদি গণবিক্ষোভে ফেটে পড়ে, তবে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।

“বাঁশখালীর স্থানীয় চাহিদা ও জনভোগান্তি বিবেচনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা জরুরি।”

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles