ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের অন্তত ১৮টি উপজেলা কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তুলে ছাত্রদল এবং বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কোথাও বিক্ষোভ ও মানববন্ধন এবং কোথাও ইউএনও কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটেছে। আবার কোথাও সরকারি দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিও উঠেছে। এ ছাড়া একজন ইউএনওকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এবং দুই ছাত্রদল নেতার পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় সরকারি দায়িত্ব পালনে বিব্রতবোধ করছেন ইউএনও ও ডিসিরা।
এর মধ্যে গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ইউএনওর কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী এবং নিয়োগে উত্তীর্ণ হতে না পারা ব্যক্তিরা ফল বাতিলের দাবিতে উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে একটি কক্ষের জানালা এবং বারান্দায় থাকা চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করা হয়।
এ ঘটনায় ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া বলেন, আমি নিজেও সুপারভাইজার পদে আবেদন করেছিলাম। আমার নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই। আমার আরও দুবার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার অভিযোগ, উপজেলার সাত ইউনিয়নে মাত্র চার থেকে পাঁচজন নেতাকর্মীর চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রকাশিত ফলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নামও রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এ কারণে দলীয় নেতা-কর্মী ও নিয়োগবঞ্চিত ব্যক্তিরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই ঘটনা ঘটান বলে তিনি জানান। তবে ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হোদা বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি।

ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোস্তাফিজুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের ফল প্রকাশের পর আমাদের কার্যালয়ে ভাঙচুরের যে ঘটনা ঘটেছে, আপনারা যেভাবে দেখেছেন, বিষয়টি সেভাবেই ঘটেছে। আমরা বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করছি এবং তথ্য সংগ্রহ করছি। গতকাল আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সার্বিক বিষয় জানিয়ে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগতসহ অন্যান্য যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেদিকে আমরা এগোব।’
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও একই অভিযোগে বিক্ষোভ হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল উপজেলা সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে সমাবেশ হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কার্যালয়ের মূল ফটক এবং উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা ইউএনও ও সমাজসেবা কর্মকর্তার বদলির দাবি জানান।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ডের ফল প্রকাশের পর আমাদের কার্যালয়ে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ফুলছড়ি উপজেলায়। তবে আমাদের কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি অফিসে কেউ তালা দিতে পারে না। যদিও আমরা আজ (সোমবার) সকাল থেকেই অফিসের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে।’ তালা দেওয়ার ঘটনায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ইউএনও বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’ সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনায় কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘অফিসে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই একটু অসুবিধা হয়। বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়।’
উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, সমাজসেবা কার্যালয়ে কথা বলতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি সপ্তাহে এক-দুই দিন অফিসে আসেন বলে তারা শুনেছেন। এ কারণে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা কার্যালয়ে তালা দেন। পরে ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে আগে থেকেই তালা ছিল। ভেতরে ঢুকে কথা বলার সুযোগ না থাকায় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা সেখানে আরেকটি তালা ঝুলিয়ে দেন। কর্মসূচিতে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ, সদস্যসচিব মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক, পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন ভূঁইয়া লিপন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার হোসেন পপেল, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুর রহমান, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ারা, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মতিয়ার রহমান এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ওয়ালি উজ্জামান মণ্ডল রিয়ালসহ নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সোমবার রাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছে ছাত্রদল। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ ও সদস্যসচিব সোহেল রশিদ হৃদয়ের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা প্রথমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে পলাশবাড়ী চৌমাথায় সড়ক অবরোধ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার অপসারণ দাবি করেন। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ অভিযোগ করেন, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের’ লোকজনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নিয়োগবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াতেই তারা বিক্ষোভ করেছেন বলে জানান তিনি।


