নিজস্ব প্রতিবেদক : জলকদর নিউজ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেও চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইন আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তবে এসব শিক্ষার্থীর সবাই যে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য এখনো শিক্ষা প্রশাসনের হাতে নেই।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৪ জন। ফলে হিসাব অনুযায়ী ১ লাখ ৪৮ হাজার ২২৮ জন পাস করা শিক্ষার্থী একাদশে ভর্তির অনলাইন আবেদন করেনি।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপের অনলাইন আবেদনের সময় শেষ হয়। আবেদন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের কলেজ নির্ধারণ করে আবেদন করেছে। পরবর্তী ধাপে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ফল, কলেজের আসনসংখ্যা, নির্ধারিত যোগ্যতা ও শিক্ষার্থীর পছন্দক্রমের ভিত্তিতে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হয়।
কেন আবেদন করেনি এত শিক্ষার্থী?
সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, একাদশে আবেদন না করা সব শিক্ষার্থীকে ঝরে পড়া হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাদের একটি অংশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন কারিগরি ও ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতে পারে। কেউ কেউ নার্সিংসহ পেশাভিত্তিক শিক্ষায় যেতে পারে। আবার কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা বা কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়ার পরিকল্পনাও করতে পারে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানও জানিয়েছেন, পাস করা প্রত্যেক শিক্ষার্থী যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবে, এমন নয়। বিভিন্ন শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং, পলিটেকনিকসহ অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় যেতে পারে।
তবে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিও স্বীকার করা হয়েছে যে, কিছু শিক্ষার্থী সত্যিকার অর্থেই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়তে পারে। বিশেষ করে আর্থিক সংকট, বিদেশে চলে যাওয়া, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া কিংবা মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের মতো সামাজিক বাস্তবতা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
কলেজগুলোতেও শিক্ষার্থী সংকট
এদিকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য দেশে সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে মোট আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। অথচ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে ১১ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। ফলে সব পাস করা শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। রাজধানী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের নামি কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ থাকায় সেখানে ভর্তির প্রতিযোগিতা বেশি। অন্যদিকে অনেক মফস্বল ও গ্রামীণ কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একই সময়ে কোথাও আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীর অভাবে আসন খালি থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আবেদন করেও কলেজ পায়নি হাজারো শিক্ষার্থী
শুধু আবেদন না করা শিক্ষার্থীরাই নয়, আবেদন করেও অনেকে পছন্দের কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়নি। একাদশ শ্রেণির প্রথম ধাপের ফলাফলে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন আবেদনকারী নির্বাচিত হয়েছে। অন্যদিকে ১৪ হাজার ৪১৫ জন আবেদন করেও কোনো আসন পায়নি। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থীও রয়েছে।
এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সীমিতসংখ্যক নামি কলেজকে পছন্দের তালিকায় রাখায় এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফলে কোনো কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফল করেও পছন্দের তালিকায় দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিতেই নির্বাচিত হয়নি।
দেড় লাখ শিক্ষার্থীর পরবর্তী গন্তব্য কোথায়?
এসএসসি পাসের পর একাদশে আবেদন না করা প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কোথায় যাচ্ছে?
তাদের কেউ কারিগরি শিক্ষা বা ডিপ্লোমা কোর্সে যাচ্ছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ কর্মজীবনে প্রবেশ করছে—এমন সম্ভাবনা রয়েছে। আবার একটি অংশ হয়তো আর কোনো ধরনের শিক্ষায় যুক্ত হচ্ছে না।
তাই শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীদের গতিপথ অনুসরণ করার জন্য কার্যকর তথ্যভান্ডার বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে, কতজন উচ্চমাধ্যমিকে যাচ্ছে, কতজন কারিগরি শিক্ষায় যাচ্ছে এবং কতজন সত্যিকার অর্থে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো শেষ হলে প্রকৃতপক্ষে কতজন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছে, কতজন কারিগরি বা অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় গেছে এবং কতজন শিক্ষার বাইরে রয়েছে—সে চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কলেজে আসন খালি থাকা কিংবা ভর্তি আবেদনের সংখ্যা দিয়ে বিষয়টি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। মাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার সুযোগ, কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষায় প্রবেশ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ঝরে পড়ার কারণগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অতএব, এসএসসি পাস করেও একাদশে আবেদন না করা ১ লাখ ৪৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন হলো—তারা কি অন্য শিক্ষাব্যবস্থায় যাচ্ছে, নাকি সত্যিই শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে? এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পেতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট তথ্য ও শিক্ষার্থীদের পরবর্তী অবস্থান অনুসরণের কার্যকর ব্যবস্থা।


