মোহাম্মদ হেফাজ উদ্দীন : ডেস্ক রিপোর্ট (ইসলাম)
ড়মানুষের জীবনে রিযিক ও তার বরকত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তবে ইসলামি শিক্ষায় কিছু গুনাহ ও নৈতিক অপরাধ থেকে বিরত থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ মানুষের জীবনে অশান্তি, অভাব ও রিযিকের বরকত কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে বলে আলেমরা উল্লেখ করেন।
ইসলামি আলোচনায় রিযিকের বরকত নষ্ট হওয়ার সঙ্গে যেসব কাজকে সম্পৃক্ত করা হয়, তার মধ্যে রয়েছে—
১. সুদ গ্রহণ ও লেনদেন: কোরআনে সুদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। সূরা আল-বাকারার ২৭৯ নম্বর আয়াতে সুদ ত্যাগ না করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।
২. অকৃতজ্ঞতা: আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ না থাকা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সূরা ইবরাহীমের ৭ নম্বর আয়াতে কৃতজ্ঞতার কারণে নিয়ামত বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা: হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সঙ্গে রিযিক প্রশস্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারির ২৯৮৬ নম্বর হাদিসে এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে।
৪. অসততা: ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো লেনদেনে মিথ্যা ও অসততা অবলম্বন করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
৫. প্রতারণা: মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা গুরুতর অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ — সহিহ মুসলিম।
৬. সালাত অবহেলা করা: নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ফরজ ইবাদত। সালাতকে অবহেলা করা একজন মুসলিমের জন্য গুরুতর বিষয়।
৭. গীবত: কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে—এটি গীবত। সূরা আল-হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে গীবত থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
৮. অহংকার: অহংকার ইসলামে নিন্দনীয়। সহিহ মুসলিমের ৯১ নম্বর হাদিসে অহংকারের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।
৯. যাকাত আদায় না করা: সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফরজ যাকাত আদায় না করা গুরুতর গুনাহ। সূরা আত-তাওবার ৩৪-৩৫ নম্বর আয়াতে সম্পদ জমিয়ে রেখে আল্লাহর পথে ব্যয় না করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
১০. শ্রমিক-কর্মচারীর হক নষ্ট করা: কর্মচারী বা শ্রমিকের প্রাপ্য পারিশ্রমিক আটকে রাখা জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা যথাসময়ে পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
১১. পণ্যের দোষ গোপন করে বিক্রি করা: বেচাকেনায় পণ্যের ত্রুটি গোপন করা প্রতারণার শামিল। এ ধরনের লেনদেনে বৈধ উপার্জনের নীতি লঙ্ঘিত হয়।
১২. অতিরিক্ত লোভ: সম্পদের প্রতি সীমাহীন লোভ মানুষকে অন্যায় পথে নিয়ে যেতে পারে। সহিহ বুখারির ৬৪৩৯ নম্বর হাদিসে মানুষের সম্পদের প্রতি অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩. বাবা-মায়ের অবহেলা: বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অবহেলা গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
১৪. জুলুম করে সম্পদ অর্জন: অন্যের অধিকার নষ্ট করে কিংবা অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন ইসলামে নিষিদ্ধ। হারাম উপার্জনে প্রকৃত বরকত থাকে না।
১৫. সদকা থেকে বিরত থাকা: সহিহ মুসলিমের ২৫৮৮ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ তাই সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
১৬. হিংসা: অন্যের নিয়ামত দেখে হিংসা করা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। ইসলাম অন্যের জন্য কল্যাণ কামনা ও আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়।
১৭. নারী ও শিশুদের ওপর জুলুম: পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার গুরুতর অপরাধ। ইসলাম পরিবারে ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।
১৮. মিথ্যা কসম: ব্যবসায়িক স্বার্থে মিথ্যা কসম করা হারাম। সহিহ বুখারির ২০৮৭ নম্বর হাদিসে এ ধরনের লেনদেনের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
১৯. অলসতা ও কর্মবিমুখতা: ইসলাম বৈধ উপায়ে চেষ্টা ও পরিশ্রম করতে উৎসাহিত করেছে। শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে কর্মবিমুখ থাকা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২০. আল্লাহর ফয়সালায় অসন্তুষ্টি: মুমিনের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা ও ধৈর্য ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। বিপদ-আপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার শিক্ষা ইসলাম দিয়েছে।
ইসলামি শিক্ষার আলোকে তাই হালাল উপার্জন, সততা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণ, নামাজ-যাকাত আদায়, দান-সদকা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুদ, প্রতারণা, জুলুম, গীবত, মিথ্যা ও অন্যায় উপার্জন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে।


