তাসমিনা খন্দকার, লন্ডন।
বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় অর্থ পাচারকারী এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের আমলনামা।
চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে জন্ম নেওয়া এই রাঘববোয়াল আজ দেশের ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচার করে লন্ডনে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী রূখমিলা জামান, যিনি অন্যায়ভাবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB)-এর চেয়ারপারসন সেজে বসেছিলেন।
এই স্বামী-স্ত্রী মিলে ব্যাংক লুটপাট করেছেন, আর তাঁদের সন্তানদের মানুষ করেছেন বিদেশের মাটিতে রাজকীয় কায়দায়। জাভেদের তিন সন্তান—জেবা, জারিয়া এবং সাদাকাত—সবাই আমেরিকার নাগরিক এবং ব্রিটেনের দামি দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পড়াশোনা করেছেন।
আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ মন্ত্রী-এমপিদের সব ছেলেমেয়েরই আজ ব্রিটিশ পাসপোর্ট ও আমেরিকার নাগরিকত্বে আছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে এদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে আর বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন।
অথচ এই টাকাগুলো কার? এগুলো আমাদের দেশের খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত জল করা লুটপাটের টাকা! এরা নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে পুরো দেশটা গিলে খেয়েছে, অথচ আওয়ামী লীগের সাধারণ তৃণমূলের মানুষের কথা এরা কোনোদিন চিন্তাও করেনি! লন্ডনে পাচার করা টাকা বৈধ করতে জাভেদ ২০১৯ সালের ৬ই জুলাই ‘ব্রিটিশ কোম্পানি হাউজ’-এ ‘রূখমিলা প্রপার্টিজ লিমিটেড’ (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ১২০৮৯৫৬৪, ম্যানচেস্টার ঠিকানা) নামে কোম্পানি খোলেন।
দেশের মানুষের কাছে আমার একটা সাধারণ প্রশ্ন লন্ডন, দুবাই আর আমেরিকায় শত শত প্রপার্টি ও কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করার পর, সে এত সময় দেশের বাইরে থাকল কীভাবে? সে যদি বছরের পর বছর লন্ডনে ও দুবাইয়ে বসে নিজের বিজনেস সাম্রাজ্য দেখাশোনা করে, তবে সে বাংলাদেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকায় মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করল কখন?
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ ও ‘ব্লুমবার্গ ’-এর ইনভেস্টিগেশন অনুযায়ী, লন্ডনে তাঁর নামে-বেনামে প্রায় ৩৬০টিরও বেশি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে! শুধু লন্ডনই নয়, দুবাইয়ে জাভেদের নিজের নামে ২৫০টি এবং তাঁর স্ত্রীর নামে আরও ৫০টি আলিশান অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। এমনকি আমেরিকার নিউইয়র্কের ম্যানহাটনেও তাঁর রয়েছে ৫টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রপার্টি।
দেশের সম্পদ চুরির দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যেই জাভেদ ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও ব্যাংক জালিয়াতির একাধিক মামলা করেছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আদালত এই দম্পতির দেশ-বিদেশের সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি ক্রোক বা জব্দের নির্দেশ দেয়। এই লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধারে আজ একটি বড় খবর এসেছে—আজ ৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে, আমেরিকার এফবিআই (FBI) জাভেদের সম্পদের গোপন রিপোর্ট দুদককে পাঠিয়েছে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, লন্ডনেও ব্রিটেনের ‘ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA) জাভেদের প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের ৩৪২টি বাড়ি পুরোপুরি জব্দ করেছে! লন্ডনের ‘সেন্ট জনস উড’ (St John’s Wood, পোস্টকোড: NW8) এলাকায় জাভেদের একটি ১১ মিলিয়ন পাউন্ডের (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা) আলিশান রাজপ্রাসাদ রয়েছে, যা বর্তমানে ব্রিটিশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি আজ লন্ডনের হাইকোর্টে জাভেদের বিরুদ্ধে ব্যাংক দেউলিয়া (Bankruptcy) ঘোষণা করার জন্য আইনি মামলা দায়ের করা হয়েছে!
বর্তমানে আইনের হাত থেকে বাঁচতে এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এড়াতে এই চোর লন্ডনের গোপন আস্তানায় আত্মগোপন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে! সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সরকারি সামান্য বেতন পেয়েও কীভাবে সে এত হাজার কোটি টাকার মালিক হলো? তাঁর আয়ের সবচেয়ে বড় খাত ছিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা সরাসরি আত্মসাৎ এবং সরকারি জমি কেনাবেচায় বিপুল ঘুষ গ্রহণ।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB) থেকে জালিয়াতি করে শত শত কোটি টাকার ভুয়া ঋণ নিয়ে তা সরাসরি বিদেশে পাচার করেছেন। বিদেশের মাটিতে ‘শেল কোম্পানি’ বা ভুয়া কাগজের প্রতিষ্ঠান খুলে কর ফাঁকি দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লন্ডনে সরিয়েছেন। চড়া সুদে মর্টগেজ লোন নিয়ে এবং ব্যাংকের আমানতের টাকা নয়ছয় করে অবৈধভাবে এই বিশাল রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়েছেন।
বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন সরকারি বড় বড় প্রজেক্টের কমিশন থেকে অবৈধভাবে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।


