সংগৃহীত
আমি পঁচিশ বছর ধরে কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করি। চিঠি, পার্সেল, কাগজপত্র, নোটিশ, সব পৌঁছে দিই। আগে চিঠি বেশি আসতো। এখন আসে ব্যাংকের কাগজ, চাকরির কাগজ, আদালতের নোটিশ, অনলাইন অর্ডারের বাক্স।

আমার নাম কামাল। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, হাজারীবাগ, এই এলাকাগুলোতে আমার রুট। প্রতিদিন একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘুরি। বৃষ্টি হলে ভিজি। রোদ হলে পুড়ি। শীত হলে কাঁপি। কাজটা ভালো লাগে না। তবু ছাড়িনি।
আমাদের অফিসে একটা নিয়ম আছে। ঠিকানা ভুল হলে তিনবার চেষ্টা করতে হয়। তারপর লেখা হয়-
“প্রাপককে পাওয়া যায়নি।”
এই তিনটা শব্দ আমি জীবনে অসংখ্যবার লিখেছি। কিন্তু একদিন একটা খামের উপর এই তিনটা শব্দ লিখতে গিয়ে আমার হাত থেমে গিয়েছিল। খামের উপর লেখা ছিল-
প্রেরক: আবদুল হালিম
প্রাপক: রাশেদ হালিম
বাড়ি: ১৭/বি, লালমাটিয়া, ঢাকা।
নিচে ছোট করে লেখা-জরুরি, ব্যক্তিগত।
অর্থাৎ, আবদুল হালিম নামে এক বয়স্ক বাবা তাঁর ছেলে রাশেদ হালিমের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রেরক ও প্রাপক দুজনেরই ঠিকানা একই দেয়া- ১৭/বি, লালমাটিয়া, ঢাকা। মানে বাবা তাঁর নিজের বাড়ির ঠিকানাতেই ছেলের নামে চিঠি পোস্ট করেছেন!
আমি ঠিকানায় গিয়ে দেখি, ১৭/বি বলে কোনো বাড়িই নেই। ১৭ আছে, ১৭/এ আছে, ১৭/সি আছে,
কিন্তু ১৭/বি নেই।
পাশের দোকানের লোককে জিজ্ঞেস করলাম। লোকটা বললো, “আগে ছিল।” “এখন?” “ভেঙে ফ্ল্যাট হইছে।” “হালিম সাহেব?”
লোকটা কাঁধ ঝাঁকালো, “চিনি না।”
আমি পাশের চায়ের দোকানে গেলাম। চা-ওয়ালা বললো, “আবদুল হালিম নামে একজন ছিল।”
“কোথায় গেছে?” “মারা গেছে।” “কবে?” “অনেক বছর।”
আমি অফিসে ফিরে খামটা “প্রাপককে পাওয়া যায়নি” লিখে জমা দিতে পারতাম। দিইনি। পরদিন আবার গেলাম। ১৭ নম্বর বাড়ির পুরোনো দারোয়ানকে পেলাম। বয়স অনেক। নাম গফুর। আমি খামের নামটা বলতেই লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
”আপনি আবদুল হালিম সাহেবের ছেলের লোক?”
“না। কুরিয়ার।” লোকটা বললো, “আবদুল হালিম সাহেব তো নাই।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তার ছেলে কোথায়?” “বিদেশে।” “কোন দেশে?” “কানাডা।” “যোগাযোগ নেই?” “না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?” লোকটা বললো, “বাপ ছেলের ঝামেলা।”
এই কথাটা বাংলাদেশের মানুষের খুব প্রিয়। সবকিছুর ব্যাখ্যা এক কথায় হয়ে যায়, “ঝামেলা ছিল।”
আমি বললাম, “কী ঝামেলা?”
লোকটা বললো, “সেইটা আমি জানি না।”
তারপর একটু থেমে বললো, “তবে শেষের দিকে আবদুল হালিম সাহেব প্রতিদিন বিকেলে গেটের সামনে বসে থাকতেন।” “কেন?” “ছেলের জন্য।”
“ছেলে আসতো?” “না।” আমি চুপ করে গেলাম।
কানাডায় ছেলেটার নাম ছিল রাশেদ হালিম। ফেসবুকে খুঁজলাম। পেলাম না। লিংকডইনে পেলাম একজনকে। নাম মিলে যায়। ঢাকায় জন্ম। কানাডায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বয়সও মিলে। আমি তার প্রোফাইলের ছবি দেখলাম। একজন হাসিখুশি মানুষ। বউ। দুইটা বাচ্চা। বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি। ক্যাপশনে লেখা-
“Home is where your people are.”
আমি অনেকক্ষণ ঐ কথাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হোম ইজ হোয়্যার ইয়োর পিপল আর। মানুষ কত সহজে ইংরেজিতে এমন কথা লিখে ফেলে। নিজের ভাষায় বলতে গেলে বুক কাঁপে।
আমি তাকে মেসেজ পাঠালাম, “আপনার নামে একটা চিঠি এসেছে।” কোনো উত্তর নেই।
দুই দিন পর উত্তর এলো, “Who are you?”
আমি বললাম, “আমি কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করি। আপনার বাবা একটা চিঠি পোস্ট করেছে।”
সে লিখলো, “My father died years ago.”
আমি বললাম, “চিঠিটা আপনার জন্যই।”
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর নেই।
তারপর লিখলো, “Don’t contact me again.”
আমি চুপ করে গেলাম। চিঠিটা আমার ড্রয়ারে রয়ে গেল। তারপর এক সপ্তাহ। দুই সপ্তাহ। এক মাস। আমি চিঠিটা অফিসে জমা দিইনি।
একদিন সন্ধ্যায় রাশেদের কাছ থেকে মেসেজ এলো, “What does the letter say?”
আমি বললাম, “আমি খুলি নাই।”
সে আবার লিখলো, “Can you send me a picture?”
আমি খামের ছবি পাঠালাম। সে অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিলো না। তারপর লিখলো, “That’s my father’s handwriting.” আমি বললাম, “আপনি চিঠিটা চান?” অনেকক্ষণ পর উত্তর এলো, “Yes.”
আমি বললাম, “ঠিকানা দেন।”
সে ঠিকানা দিল। সেদিনই আমি চিঠিটা পাঠিয়ে দিলাম। কাজ শেষ। ভাবলাম, এবার আমার দায়িত্ব শেষ। তিন দিন পর একটা ফোন এলো। বিদেশি নম্বর। আমি ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা পুরুষের গলা।
”আপনি কামাল? “জি।” “আমি রাশেদ।” “জি।” “চিঠিটা পেয়েছি।” আমি চুপ করে থাকলাম।
সে বললো, “আপনি কি জানেন, আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষবার আমাকে কী বলেছিলেন?”
“না।” “বলেছিলেন, তুই যদি কোনোদিন ফিরে আসিস, আমার কাছে আসিস না।” আমি কিছু বললাম না।
সে বললো, “আমি আর ফিরিনি।” তারপর দীর্ঘ নীরবতা। ”চিঠিতে কী ছিল জানেন?” “না।”
সে হাসলো। তারপর বললো, “আমার বাবা কখনো কাউকে চিঠি লিখতেন না।” আমি অবাক হলাম।
বললাম, “কিন্তু এটা তো আপনার বাবার হাতের লেখা। “হ্যাঁ।” “তাহলে?” “তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু পাঠাননি।” আমি বুঝলাম না।
রাশেদ বললো, “চিঠিটা তিনি নিজের আলমারিতে রেখে গিয়েছিলেন।” “কীভাবে পোস্ট হলো?”
“তার বাড়ি বিক্রি করার পর নতুন মালিক পুরোনো আলমারির কাগজপত্রের মধ্যে খামটা পেয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছেন পোস্ট করা হয়নি, তাই দয়ায় পড়ে ডাকবাক্সে ফেলে দিয়েছেন।” আমি বললাম, “চিঠিতে কী ছিল?” রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “একটা মাত্র বাক্য।” “কী?” “আমি ভুল করেছিলাম।”
আমি বললাম, “এইটুকু?” “হ্যাঁ।” “আর কিছু?” “না।”
আমি বললাম, “তাহলে আপনি কাঁদছেন কেন?”
রাশেদ কান্না থামিয়ে বললো, “আমি ভেবেছিলাম, বাবারা কখনো ভুল করে না।”
আমি জানি না কেন, কথাটা শুনে আমার নিজের বাবার কথা মনে পড়লো। আমার বাবা ছিলেন রাগী মানুষ। আমি ছোটবেলায় একবার স্কুল থেকে পালিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। বাবা জানতে পেরে আমাকে এমন মেরেছিলেন যে তিনদিন স্কুলে যেতে পারিনি। তারপর আমি ঠিক করেছিলাম, কোনোদিন বাবার সঙ্গে কথা বলবো না।
দুদিন পরই বাবা মারা গেলেন। আমার রাগটা রয়ে গেল। বাবা রইলেন না। মানুষের রাগেরও একটা সমস্যা আছে। যার ওপর রাগ করা হয়, সে না থাকলেও রাগটা থেকে যায়। তারপর একদিন সেই রাগের কোনো ঠিকানা থাকে না।
রাশেদ বলল, “কামাল ভাই?” “জি?” “আপনি কি একটা কাজ করবেন?” “কী?” “আমার বাবার কবরটা খুঁজে দিতে পারবেন?” আমি বললাম, “পারবো।” “কেন জানি না, আমি যেতে চাই।” “আসবেন?” “হ্যাঁ।”
তিন মাস পর রাশেদ ঢাকায় এলো। আমি তাকে বিমানবন্দর থেকে নিতে যাইনি। কিন্তু সে নিজেই আমাকে ফোন করলে।
”কামাল ভাই, আমি ঢাকায়।” “কোথায়?” “পুরোনো বাসার সামনে।” আমি গেলাম। সে গাড়ি থেকে নামলো। আমি প্রথমে চিনতেই পারিনি। ছবির চেয়ে মানুষ বাস্তবে অন্যরকম।
সে আমাকে দেখে বললো, “আপনিই কামাল?”
“জি।”
সে হাত বাড়ালো। আমি হাত ধরলাম। তার হাত কাঁপছিল। আমরা একসঙ্গে কবরস্থানে গেলাম। তার বাবার কবর খুঁজে পেলাম। রাশেদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বসে পড়লো। কোনো দোয়া পড়লো না। কিছু বললো না। শুধু মাটির উপর হাত রাখলো।
অনেকক্ষণ পর বললো, “বাবা, আমি এসেছি।” আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে আবার বললো, “তুমি বলেছিলে, আসিস না।”
চুপ ”আমি আসিনি।” চুপ ”তুমি ভুল করেছিলে।” চুপ
“আমিও ভুল করেছিলাম বাবা।” আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দূরে সরে গেলাম। মানুষের কিছু কথার সাক্ষী হওয়া উচিত না। কিছু কথা মৃত মানুষের আর জীবিত মানুষের মাঝেই থাকা ভালো।
ফেরার সময় রাশেদ আমাকে বললো, “কামাল ভাই, আপনি না থাকলে আমি আসতাম না।”
আমি বললাম, “আমি তো শুধু চিঠি পৌঁছাইছি।”
সে বললো, “না।” “তাহলে?” “আপনি আমার কাছে একটা ঠিকানা পৌঁছে দিয়েছেন।” আমি হেসে বললাম, “কবরের ঠিকানা?” সে মাথা নাড়লো, “না।”
“তাহলে?” সে বললো, “বাবার কাছে যাওয়ার ঠিকানা।”
আমি কিছু বললাম না। অফিসে গিয়ে আমার ছেলেকে ফোন করলাম। সে ধরলো না। আবার করলাম। ধরলো।
বললো, “কী হয়েছে?” আমি বললাম, “কিছু না।”
“তাহলে ফোন করছো কেন?” আমি বললাম, “তুই কেমন আছিস?” সে বললো, “ভালো।”
আমি বললাম, “তোর সঙ্গে আমার কোনোদিন খুব বেশি রাগারাগি হয়েছে?”
ওপাশে সে হাসলো, “আপনার তো প্রতিদিনই রাগারাগি হয়।” আমি বললাম, “আমি যদি কোনোদিন ভুল করে থাকি?”
সে চুপ করে গেল। আমি বললাম, “তাহলে আমাকে বলিস।” “কেন?” “যাতে আমি ঠিক করতে পারি।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “আব্বা, আপনি ঠিক আছেন তো?” “হ্যাঁ।” “কিছু খাইছেন?” “না।”
“খেয়ে ঘুমান।”
ফোন কেটে গেল। আমি অনেকক্ষণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ড্রয়ার খুললাম। রাশেদের বাবার চিঠির একটা ফটোকপি সেখানে রেখেছিলাম। মাত্র এক লাইন। ”আমি ভুল করেছিলাম।”
আমি কাগজটা হাতে নিয়ে ভাবলাম, মানুষ পৃথিবীতে কত কিছু লিখে। উপন্যাস। কবিতা। ইতিহাস। আইন। প্রেমপত্র। ক্ষমাপত্র। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন চিঠিটা সম্ভবত এই তিনটা শব্দের, আমি ভুল করেছিলাম। এই তিনটা শব্দ বলতে একজন বাবার পঁচাত্তর বছর লাগে। একজন ছেলের ত্রিশ বছর। কখনো কখনো পুরো একটা জীবন।
পরদিন অফিসে গিয়ে টেবিলে এক পুরোনো পার্সেল পড়ে থাকতে দেখলাম। প্রাপক মৃত, প্রেরকের খোঁজ নেই। ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় ধুলো জমছে খামের উপর। আমি কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, পৃথিবীতে কত অভিমান, কত অসম্পূর্ণ কথা এভাবেই কোনো না কোনো টেবিলে ঠিকানাহীন হয়ে জমা পড়ে থাকে।
অফিসে ভালো লাগলো না। আমি বাড়ি ফিরে এলাম। আমার ছেলে তখন ঘরে বসে ফোন দেখছিল। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে তাকালো। আমি বললাম, “তোর সাথে আমার একটা কথা ছিল।” সে অবাক হয়ে বললো, “কী কথা?”
আমি ড্রয়ার থেকে রাশেদের বাবার চিঠির ফটোকপিটা বের করে তার সামনে রাখলাম।
সে খামটার দিকে, তারপর আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ উঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
অনেক বছর পর। খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু যথেষ্ট। আমি তার পিঠে হাত রাখলাম। কিছু বললাম না। আমার মনে হলো, সেদিন যদি রাশেদের বাবার চিঠিটা পৌঁছে না দিতাম, তাহলে হয়তো আমার ছেলেকে আমি এই কথাগুলো কোনোদিন বলতাম না।
আমি এখনও কুরিয়ারে কাজ করি। এখনও ভুল ঠিকানার পার্সেল আসে। এখনো অফিসে তিনটা শব্দ লেখা হয়,
“প্রাপককে পাওয়া যায়নি।”
কিন্তু আমি আর আগের মতো সহজে লিখতে পারি না। কারণ আমি জানি, কখনো কখনো মানুষ ঠিকানায় থাকে না। অভিমানে থাকে। দূরত্বে থাকে। ভুল বোঝাবুঝিতে থাকে। কখনো বিদেশে থাকে। কখনো কবরের নিচে। আর কখনো, একই বাড়িতে থেকেও একটা দরজার ওপাশে থাকে। তাই কোনো চিঠি হাতে নিয়ে যদি মনে হয়, “লোকটা তো নেই।” আমি একটু অপেক্ষা করি। কারণ ঠিকানাটা ভুল হতে পারে। কিন্তু চিঠিটা নয়। চিঠি সাধারণত ঠিক মানুষটার কাছেই যেতে চায়। শুধু পৌঁছাতে কখনো কখনো একজন কামালের দরকার হয়!
সব দূরত্ব হয়ে যাওয়া সম্পর্কেই একটাবার “আমি ভুল করেছিলাম” বলতে পারলে ঠিকানাগুলো হয়তো চোখের আড়াল হয়ে যেতো না…!প্রাপকদের খুঁজে পাওয়া যেতো…!
গল্প : সংগ্রহ।


