জলকদর নিউজ | শিক্ষাঙ্গন
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে বারবার নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুত করা প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবই বিশ্লেষণ করে ৩৫টি পৃষ্ঠায় ৮৮টির বেশি নৌকার ছবি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৭২ পৃষ্ঠায় ১০টি পৃষ্ঠায় ৩২টি নৌকার ছবি রয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের আটটি পৃষ্ঠায় ২৩টি, তৃতীয় শ্রেণির নয়টি পৃষ্ঠায় ২৫টি, চতুর্থ শ্রেণির তিনটি পৃষ্ঠায় তিনটি এবং পঞ্চম শ্রেণির পাঁচটি পৃষ্ঠায় পাঁচটি নৌকার ছবি পাওয়া গেছে। বইগুলোর প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন পাতায় এসব ছবি রয়েছে।
প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। ‘ছই’ শব্দ বোঝাতে নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি আষাঢ় মাসের বর্ণনা, বিভিন্ন শব্দের উদাহরণ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভোর হলো’ কবিতার সঙ্গে নৌকার ছবি যুক্ত করা হয়েছে। কিছু পাতায় একই ধরনের ছবি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বই ‘English for Today’-তেও নৌকার ছবি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘B for Boat’ শেখানোর জন্য নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। একই পাঠে অন্য কয়েকটি ইংরেজি বর্ণের সঙ্গে প্রাণীর ছবি থাকলেও ‘B’-এর ক্ষেত্রে নৌকার ছবি রাখা হয়েছে।
প্রাথমিকের বাংলা পাঠ্যবইয়ের লেখক-সম্পাদক হিসেবে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, পাঁচ শ্রেণির বাংলা বইয়ে নদী ও নৌকার ছবি ৪০ জায়গায় রয়েছে। বিপরীতে ধানখেত, ধানের আঁটি ও ধানের শিষের ছবি রয়েছে ৩৮ জায়গায়। নদীমাতৃক ও কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের প্রকৃতি তুলে ধরতে গিয়ে চিত্রকরদের কাজে স্বাভাবিকভাবেই এসব দৃশ্য এসেছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। তবে কোন বইয়ে কতটি নৌকার ছবি থাকবে, তা নির্দিষ্ট করে লেখক-সম্পাদকেরা পরিকল্পনা করেননি বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) আর্টিস্ট-কাম-ডিজাইনার সুদর্শন বাছার জানান, বইগুলোর গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ এনসিটিবি সরাসরি করেনি; এ জন্য ফ্রিল্যান্সার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কাজের নির্দেশনা দিয়েছিল এনসিটিবির প্রাথমিক শাখা।
২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ নিয়ে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয় এবং কয়েকজন অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে ছবি পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীও বইগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
নৌকা বাংলাদেশের নদী, জনজীবন ও সংস্কৃতির পরিচিত অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে নৌকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। ফলে পাঠ্যবইয়ে এর পুনরাবৃত্ত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও শুধু ছবির সংখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। ছবিগুলোর শিক্ষাগত প্রাসঙ্গিকতা, নকশা তৈরির প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করেই বিষয়টির মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই শিশুদের শেখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই বইয়ের প্রতিটি ছবি যেন পাঠের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।


